সোনা চোরাচালানের ক্ষেত্রে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান শিডিউলকে কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে চোরাচালান চক্র। শিডিউল অনুযায়ী বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব বণ্টন করে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিমানবন্দর থেকে সোনা বাইরে বের করা হতো। আর এই ঘটনার মূল হোতা হলেন গ্রেফতার হওয়া বিমানের চেয়ারম্যানের কথিত ‘ধর্মপুত্র’ মাহমুদুল হক ওরফে পলাশ।
এদিকে সোনা চোরাচালানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া বিমান কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক একটি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও রহস্যজনক কারণে তা বিলম্বিত হয়েছে বলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রে জানা গেছে, শাহজালাল আন্তজার্তিক বিমানবন্দরে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, কাস্টম ছাড়াও বিমান কর্মীরা দায়িত্ব পালন করে থাকেন। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের তথ্যানুযায়ী, বিমানবন্দরে কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব বণ্টন হয় সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা। আর বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের সময় হচ্ছে ভোর ৬টা থেকে দুপুর ২টা। ২টা থেকে রাত ১০টা এবং ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত। এভাবে ২৪ ঘন্টা দায়িত্ব পালন করা হয়। এক্ষেত্রে অনুসন্ধানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা বিমানের কোনো ফ্লাইটের নির্ধারিত সিডিউল যদি দুপুর ১২ থেকে ১টার মধ্যে হয়, তবে সকালের শিফটের বিমান ও কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগে থেকেই নির্ধারিত কমিশনের মাধ্যমে ম্যানেজ করা হয়। কিন্তু যদি কোনো কারণে ওই ফ্লাইট অন-টাইম (নির্ধারিত সময়ে) পৌঁছুতে না পারে, তবে পরবর্তী শিফটের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর ম্যানেজ করা হয়ে উঠে না। সেক্ষেত্রে সোনার সেই চালান ধরা পড়ে যায়।
সূত্রে জানা গেছে, সোনা চোরাচালানের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সকালের শিফট বা রাতের শিফটকে বেছে নেয় চোরাচালান চক্র। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের রুটের ফ্লাইটগুলো অনেক সময় এই সময়েই পৌঁছায়। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, সকাল বা রাতের দিকে পাঠানো চালানগুলো ধরা পড়েছে। কারণ সেইসব যাত্রী বা বিমানকর্মী সোনাগুলো নিয়ে আসে তারা নতুন শিফটের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে না। ফলে হয় ধরা পড়ে যায়, না হয় সোনা ফেলে পালিয়ে যায়।
সূত্রে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য (দুবাই, সিঙ্গাপুর, আরব আমিরাত) ফ্লাইটে সোনা চোরাচালান বেশি হলেও বর্তমানে চোরাচালান চক্রটি তাদের রুট বদল করতে শুরু করেছে। কারণ বর্তমানে এইসব রুটের ফ্লাইটগুলোর দিকে বিমানবন্দর প্রশাসনের নজরদারী বেড়েছে। তাই রুট পাল্টে বর্তমানে ইউরোপের ফ্লাইট (যেমন ইটালি, যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে আগত ফ্লাইটে) হতে সোনা চোরাচালান করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন প্রিয়.কম-কে বলেন, সবচেয়ে বড় ৩টি স্বর্ণের চোরাচালান বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে হয়েছে। বিমানকর্মীদের সহায়তা ছাড়া এত বড় চোরাচালান কখনো সম্ভব না।
তিনি বলেন, এইসব চোরাচালানের স্বর্গরাজ্য শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। সেইসঙ্গে সোনা চোরাচালানের সাথে বিমানকর্মী, সিভিল এভিয়েশনের কর্মী, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন এমনকি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারাও জড়িত থাকেন। বিভিন্ন সময়ে এ সকল সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জড়িত থাকার অভিযোগে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।
তিনি বলেন, আর্মড পুলিশ বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই আমরা চোরাচালান চক্রের সদস্যদের ধরতে নানান ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। এর মধ্যে ১২৪ কেজি সোনার চালানটি ধরতে আর্মড পুলিশের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, চলতি বছরের ২৫ জুলাই দুপুরে কাঠমান্ডু থেকে আসা বিমান বাংলাদেশের একটি উড়োজাহাজ ১২৪ কেজি সোনার একটি বড় চালান ধরা পড়ে। সোনা ভর্তি ১৫টি কালো ব্যাগ চোরাচালান চক্র উড়োজাহাজের মালামাল রাখার স্থানে (প্যাকেজিং প্যানেল) লুকিয়ে রেখেছিল। সূত্র জানায়, মূলত ওই উড়োজাহাজটি নেপালের আগে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়েছিল। সেখানকার কোনো দেশ থেকে বারগুলো উড়োজাহাজে তোলা হয়েছিল। তিনদিন ওই ব্যাগগুলো উড়োজাহাজটির সাথে বিভিন্ন দেশ ঘুরে ঢাকায় এসে ধরা পড়ে।
কারণ হিসেবে আলমগীর হোসেন বলেন, ‘‘সোনা চোরাচালানের এই পন্থাটি সম্পর্কে আমরাও জেনেছি। এক্ষেত্রে ১২৪ কেজি চালানটিতে এমনটিই হয়তো ঘটেছে যে, কাঙ্খিত শিফটের কর্মী ওই সময় তা বের করে আনেনি।’’
তিনি জানান, বিগত কয়েক বছরে শুধু এপিবিএনের মাধ্যমে ১১২ কেজি সোনা ধরা পড়েছে। এবং চোরাচালানের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগে এপিবিএন ৩ হাজার ৪১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দুবাই, বাহরাইন, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান, কুয়েত ও সৌদি আরব থেকে বিস্কিট, বার কিংবা অলঙ্কার হিসেবে এসব সোনার চালান দেশে আসে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সোনা চোরাচালান চক্র ও লাগেজ পার্টির সদস্যদেরও যোগসাজশ থাকে। সবমিলিয়েই তারা বারবার সুযোগ নেয়। কখনো বা ধরা পড়ে আবার কখনো তারা পার পেয়ে যায়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ২৬ এপ্রিল দুবাই থেকে আসা একটি উড়োজাহাজে ১০৬ কেজি সোনা উদ্ধার করেন শাহজালাল বিমানবন্দরের শুল্ক কর্মকর্তারা। ওইদিন বেলা সোয়া ২টার দিকে বিমানের ০৫২ ফ্লাইটের টয়লেটে এই চালানে ৯৩৬টি সোনার বার পাওয়া যায়। মূলত এই চালানটিও চোরাচালানের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিমানকর্মী বা কাস্টমস কর্মীর শিফট পরিবর্তনের ফলে ধরা পড়েছে বলে সূত্রে জানা যায়।
এছাড়া ২০১৩ সালের বাংলাদেশ বিমানের একটি উড়োজাহাজে প্রায় ৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ২৫ কেজি ৩১০ গ্রাম ওজনের ২১৭টি সোনার বার পাওয়া যায়। এই চালানটিও ধরা পড়ে ওইদিন দুপুরে।
গত বুধবার সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে স্বয়ং বিমানের চেয়ারম্যানের কথিত ‘ধর্মপুত্র’ মাহমুদুল হক ওরফে পলাশসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের তিনজন পদস্থ কর্মকর্তাও রয়েছেন। তারা হলেন- চিফ অব প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিউলিং ক্যাপ্টেন আবু মোহাম্মদ আসলাম শহীদ, ফ্লাইট সার্ভিস শাখার উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এমদাদ হোসেন ও ব্যবস্থাপক (শিডিউলিং) তোজাম্মেল হোসেন। এছাড়া হারুন-অর রশিদ নামে একজন মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীও রয়েছেন।
সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিমানের সিনিয়র পাইলট, চিফ অব প্ল্যানিং ও শিডিউলিংয়ের কাজে কর্মরত কর্মকর্তারাও সোনা চোরাচালান অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।
বিমান সূত্র জানায়, কোন পাইলট কবে কোন ফ্লাইটে দায়িত্ব পালন করবেন, তা ঠিক করতেন গ্রেফতার হওয়া ক্যাপ্টেন শহীদ। আর গ্রেফতার হওয়া ডিজিএম এমদাদ ও ব্যবস্থাপক তোজাম্মেল কেবিন ক্রুদের দায়িত্ব বণ্টন করতেন। অভিযোগ রয়েছে, চোরাচালান চক্রের পছন্দের কর্মীরা যাতে নির্দিষ্ট ফ্লাইটে দায়িত্ব পান, তা এসব কর্মকর্তা নিশ্চিত করতেন। আর তাদের পদে থাকাটা নির্বিঘ্ন করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা ছিল পলাশের। পদে না থেকেও পলাশ নিয়মিত বিমান কার্যালয়ে যেতেন।
জানা গেছে, হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্বঘোষিত সম্রাট ছিলেন মাহমুদুল হক পলাশ। স্ত্রী কেবিন ক্রু নূরজাহান, ডিজিএম এমদাদ, পাইলট আবু আসলাম শহীদসহ ১০ জনের একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন তিনি। সোনা চোরাচালানের টপ সিন্ডিকিটের অন্তত ৭ জন এখনো রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। সব মিলিয়ে অন্তত ৫০ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী এই সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য।
শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ২০ মাসে শুল্ক বিভাগ ও শুল্ক গোয়েন্দারা হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক হাজার ১৮ কেজি সোনা উদ্ধার করেছেন। ঢাকা বিমানবন্দর থানার গত জানুয়ারি থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সোনা উদ্ধারের ঘটনায় ৯৫টি মামলা হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছে ১১৯ জন।
এছাড়াও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এপর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬শ কেজি সোনা উদ্ধারের ঘটনায় মোট ৮২ জনকে আটক করেছে শুল্ক গোয়েন্দা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চোরাচালানের ঘটনা সম্পর্কে বিমানকর্মীরা অবগত ছিলেন বলে অধিকাংশ আসামি স্বীকার করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের একজন কর্মকর্তা প্রিয়.কমকে বলেন, সোনা চোরাচালানের সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে বিমানের এইসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু বিমানের উপরের মহল থেকে এ বিষয়টি রহস্যজনক কারণে আমলেই নেয়া হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক এ মহলটির চাপে শেষ পর্যন্ত বিমানের চেয়ারম্যানের কথিত ‘ধর্মপুত্র’ ও তিনজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাসহ পাঁচজনকে আটক করেছে পুলিশ।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সূত্রে জানা যায়, বিমানের চেয়ারম্যানের কথিত ‘ধর্মপুত্র’ মাহমুদুল হক ওরফে পলাশ এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের তিনজন পদস্থ কর্মকর্তা সহ পাঁচজনই আটক হলেও চোরাচালানের সঙ্গে উচ্চ মহলের আরো অনেকেই জড়িত রয়েছেন। আর তাদের কমিশন না দিয়ে বিমানবন্দর থেকে সোনার চোরাচালান বের করা সম্ভব হতো না। তবে বিভিন্ন সময়ে নিম্ন স্তরের কর্মী গ্রেফতার হলেও ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা গ্রেফতার হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার সোনা চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতারকৃত বিমান কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বেসরকারি বিমান মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন।