বরগুনার তালতলীতে বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নয়নের জন্য আবারো নৌকায় ভোট চেয়ে বলেছেন, দেশে উন্নয়নের যে ধারা সূচনা হয়েছে তা অব্যাহত রাখতে আরেকটিবার আওয়ামী লীগকে ভোট দিন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই উন্নয়ন করে। আপনারা নৌকায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে সেবার সুযোগ দিয়েছেন। এজন্য আমাদের কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জনগণের প্রতি। নৌকা মানেই উন্নয়ন। এই নৌকায় ভোট দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। নৌকায় ভোট দিয়ে মানুষ কখনো ঠকেনি। যখনই ভোট দিয়েছে উন্নয়ন হয়েছে।তালতলী উপজেলার বরবগি ইউনিয়নের সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বিশাল সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তার ৩০ মিনিটের বক্তৃতায় সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে বলেন, যখনই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকে তখনই দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ কিছু না কিছু পায়। তিনি তালতলীবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন- ২০১৪ সালেও আমি আপনাদের এ মাঠে বক্তব্য দিয়েছিলাম। বরগুনাসহ উপকূলে যে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তাতে তালতলীবাসী বেশি সুবিধা পাবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ সুবিধাও পাবেন।
তিনি বলেন, জাতির পিতা সাড়ে তিন বছরে মানুষের জীবন-মান উন্নয়নে কাজ করেছেন। তার সেই নির্দেশনা মেনেই আমরা রাষ্ট্র পরিচালনা করছি। আপনারা নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছেন সেজন্য আমরা উন্নয়ন করতে পেরেছি। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে হবে। এ সময় উপস্থিত জনতা স্ল্লোগান দিয়ে নৌকায় ভোট দেয়ার অঙ্গীকার করেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাবা-মা সব হারিয়ে, সেই শোক-ব্যথা বুকে নিয়েও আমি কাজ করে যাচ্ছি। কাদের জন্য? বাংলার মানুষের জন্য। কারণ এই মানুষের জন্যই আমার বাবা জীবন দিয়ে গেছেন। আমার মা জীবন দিয়ে গেছেন, আমার ভাইয়েরা জীবন দিয়ে গেছেন। আমি সব স্বজন হারিয়েছি, স্বজন হারানোর বেদনা নিয়েও আজকে আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছি শুধু একটাই কারণে, বাংলাদেশকে যেন আমার বাবার স্বপ্নের ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়তে পারি।
তিনি বলেন, দক্ষিণাঞ্চল সবসময় অবহেলিত ছিলো। আমরা পায়রা বন্দর, স্কুুল, কলেজ, কালভার্ট, সেতুসহ অনেক উন্নয়ন করেছি। ভবিষ্যতে আর কষ্ট করতে হবে না। পায়রায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলে আরো বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। নদীপথ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নৌ-পথ সচলের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করতে লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসল উৎপাদনে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামী একশ’ বছর পর যে বাংলাদেশ হবে সে অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করে কাজ করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী ১৫ই আগস্টের ভয়াল স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমার জীবনের চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই। এদেশের মানুষ ভালো থাকবে এটাই আমার লক্ষ্য। ২১শে আগস্ট খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান আমাকে গ্রেনেড ছুড়ে হত্যা করতে চেয়েছিলো। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থেকে দেশকে ৫ বার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করে জঙ্গিবাদের উত্থান করেছিলো। তারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না তাই মানি লন্ডারিং সহ নানান অপকর্মে জড়িত রয়েছে। তিনি বলেন, এতিমদের টাকা চুরির দায়ে খালেদা জিয়ার জেল হয়েছে। এতিমদের টাকা আসে এতিমদের জন্য, এতিমদের সম্পদ মেরে খেলে শাস্তি পেতে হয়। আমরা বৃত্তি দিচ্ছি গরিব মায়েদের মোবাইলে বৃত্তির টাকা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। এ বছর এক কোটি ১০ লাখ মায়ের হাতে মোবাইলের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে শিক্ষার উন্নয়নে। দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ফান্ড থেকে প্রাইমারি থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন স্বল্প নয় উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে এগিয়ে যাবে। ২০২১ সালে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবো।
২১ উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন
প্রধানমন্ত্রী বরগুনায় ২১টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এসব প্রকল্প হলো, সদর হাসপাতালকে ৫০ শয্যা হতে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ; বামনা উপজেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন; বেতাগী উপজেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন; বরগুনা জেলা গণগ্রন্থাগার; বরগুনা জেলা পুলিশ লাইনে মহিলা ব্যারাক নির্মাণ; দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য হোস্টেল নির্মাণ এবং সমপ্রসারণ’- শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় বরগুনা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য পূর্বে নির্মিত একতলা হোস্টেলের উপর ২য়তলা হোস্টেল নির্মাণ সহ ১মতলার নবায়ন; বরগুনা জেলার আমতলী থানা ভবন; বরগুনা সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিস; ডৌয়াতলা ইউনিয়ন ভূমি অফিস (উপকূলীয়), হোসনাবাদ ইউনিয়ন ভূমি অফিস (উপকূলীয়); ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন; এম বালিয়াতলী ডিএন কলেজের ৪তলা একাডেমিক ভবন কাম ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, বরগুনা সদর; সৈয়দ ফজলুল হক ডিগ্রি কলেজের ৪তলা একাডেমিক ভবন কাম ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, পাথরঘাটা; ইউনুস আলী খান ডিগ্রি কলেজের ৪তলা একাডেমিক ভবন কাম ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, আমতলী; উপজেলা প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্র, তালতলী; বাকেরগঞ্জ-পাদ্রীশিবপুর-কাঁঠালতলী-সুবিদখালী-বরগুনা সড়ক প্রশস্তকরণ ও মজবুতিকরণ; চুড়িরচর ইউনিয়ন পরিষদ-হাজারবিঘা-কামড়াবাদ-পুরাকাটা ফেরিঘাট সড়কের ৫৩২০.০০ মি. চেইনেজে ৫৪.০০ মি. আরসিসি গার্ডার ব্রিজ; গৌরীচন্না ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন; বেতাগী উপজেলাধীন বদনীখালী খালের উপর চেইনেজে ও আরসিসি গার্ডার ব্রিজ; তালতলী উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন; বামনা উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন সমপ্রসারণ; একটি বাড়ি একটি খামার ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক ভবন, তালতলী।
তালতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রেজবি-উল কবির জমাদ্দারের সভাপতিত্বে বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপি, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পরিবীক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক (মন্ত্রী) আবুল হাসানাত আবদুুল্লাহ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, চিফ হুইপ আসম ফিরোজ, বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস এমপি, বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এমপি, শওকত হাচানুর রহমান এমপি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এডভোকেট আফজাল হোসেন, বরগুনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, বেতাগী পৌরসভার মেয়র এবিএম গোলাম কবির। সভা সঞ্চালনা করেন বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির ও সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম সরওয়ার টুকু।
পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনর্বাসন প্রকল্প উদ্বোধন
পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল বিকালে কলাপাড়ায় পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনর্বাসন প্রকল্প উদ্বোধন এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্র চত্বরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বপ্নের ঠিকানা নামে এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন।
তিনি প্রকল্প এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের জন্য নবনির্মিত ঘরগুলো পরিদর্শন করেন এবং পুনর্বাসিত পরিবারের কাছে ঘরের চাবি ও রেজিস্ট্রেশন পেপার হস্তান্তর করেন।
তিনি পুনর্বাসন কেন্দ্রের পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত করেন এবং গাছের চারা রোপণ করেন। এর আগে তিনি পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এখানে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব আহমেদ কায়কাউস এবং প্রকল্প পরিচালক প্লান্টের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। প্রধানমন্ত্রী সমবেত শ্রমিকদের সামনে বক্তব্য রাখেন এবং বলেন, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। শেখ হাসিনা প্রকল্প শেষ করার জন্য যারা দিনরাত কাজ করছেন সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ১০ বছরে ২০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে।
মন্ত্রীবর্গ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এবং ঊর্ধ্বতন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড এবং চায়নিজ সিএমসি কোম্পানি যৌথভাবে অত্যাধুনিক এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা ১৪৯৭ মেগাওয়াট এবং ভবিষ্যতে উৎপাদন ৬১৩০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই অনুষ্ঠানে পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী পটুয়াখালী জেলার ১৬টি উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করেন। প্রকল্পগুলো হলো- পটুয়াখালী সরকারি কলেজের ৫ তলা বিশিষ্ট গার্লস হোস্টেল এবং একাডেমিক কাম-পরীক্ষা হল নির্মাণ কাজ, হাজী আক্কেল আলী হাওলাদার কলেজের ৪তলা বিশিষ্ট একাডেমিক ভবন নির্মাণ, ইসহাক মডেল ডিগ্রি কলেজ, কুয়াকাটা খানাবাদ কলেজ, মুক্তিযোদ্ধা মেমোরিয়াল কলেজ, আলহাজ জালাল উদ্দিন কলেজ, সুবিদখালী ডিগ্রি এবং দুমকি জনতা ডিগ্রি কলেজের ৪তলা বিশিষ্ট একাডেমিক ভবন নির্মাণ, দুমকি উপজেলা শতভাগ বিদ্যুতায়ন, মির্জাগঞ্জ ৩৩/১ কেভি বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন, পায়রা বন্দর ও সার্ভিস জেটির মধ্যে শেখ হাসিনা সড়ক, মসজিদ, পায়রা বন্দরে অফিসার্স গেস্ট হাউস এবং ডরমিটরি উদ্বোধন করেন।