বার্লিন প্রাচীর
ভেঙে ফেলা হয়েছে সেও
তো সিকি শতাব্দী হয়ে গেল। কিন্তু
বহুল আলোচিত ওই প্রাচীর এখন
কোথায়?
আসলে বলা ভালো বার্লিনের সেই
প্রাচীর কোথায় নেই? প্রায় তিন
দশকজুড়ে অটল দাঁড়িয়ে থাকা ওই
প্রাচীর ভেঙে ফেলার সময় থেকেই
টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে স
আর এখন যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল
থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল,
দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন
থেকে অস্ট্রেলিয়ার
ক্যানবেরা পর্যন্ত বার্লিন
প্রাচীরের যত
টুকরো আলাদা দাঁড়িয়ে আছে খোদ
বার্লিনেও প্রাচীরের ততটা অংশ
নেই! দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে এ
সম্পর্কে জানিয়েছে।
বার্লিনের বোটানিক্যাল
গার্ডেনের কেয়ারটেকারের
বাংলোর পেছনে দর্শনার্থীদের
চোখের আড়ালে ইউরোপের
ইতিহাসের কিছু কংক্রিট-কঠিন অধ্যায়
লুকানো আছে। ৩ দশমিক ২ মিটার উঁচু
এবং ১ দশমিক ২ মিটার চওড়া আর ২
দশমিক ৬ টন ওজনের ওই সব কংক্রিট-
স্লাবের এক পাশে বর্ণিল সব
গ্রাফিতি। ১৯৬১ থেকে ১৯৮৯ সাল
পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা বার্লিন
প্রাচীরের জন্য এমন ৫৪ হাজার
কংক্রিট-স্লাব বানানো হয়েছিল
প্রাচীর পশ্চিম জার্মানি অংশের
জন্য।
বোটানিক্যাল গার্ডেনের
মজুতঘরে থাকা এই কংক্রিট-
স্লাবগুলো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের
অতিথিদের উপহার দেওয়ার জন্য
জমিয়ে রাখা। এই উপহার
পাওয়া অতিথিরা খুশির বন্যায়
ভেসে যাওয়ার মতোই দীর্ঘ
বিড়ম্বনাতেও পড়তে পারেন। আড়াই
টনের চেয়ে বেশি ওজনের এমন
একটা কংক্রিট-স্লাব
বয়ে নিতে তাঁকে ক্রেন
ভাড়া করে ভ্যানে তুলতে হবে। শুধু এর
খরচই দুই হাজার ইউরোর মতো। আর
জাহাজে করে তা ভিনদেশে নিয়ে
খরচ তো আছেই। ফলে উপহার পেয়েও
বার্লিন প্রাচীরের
একটা টুকরো বয়ে নিয়ে যাননি এমন
ঘটনাও ঘটেছে!
বার্লিনে ঘুরতে আসা যেকোনো পর্
মুখে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত
প্রশ্নগুলোর
একটা নিঃসন্দেহে ‘বার্লিন
প্রাচীরটা কোথায়?’ কিন্তু প্রাচীর
ভেঙে দেওয়ার ২৫ বছরের মধ্যেই
আক্ষরিক অর্থেই বার্লিন প্রাচীরের
খণ্ড খণ্ড কংক্রিট-স্লাবগুলো দুনিয়ার
এত শহরে ছড়িয়ে গেছে যে, খোদ
বার্লিনেও এখন প্রাচীরের
অতটা অংশ নেই। জার্মানদের
কাছে এই প্রাচীর এক দুঃসহ অতীতের
স্মৃতিভরা হলেও পশ্চিমসহ দুনিয়ার অন্য
অনেক অংশের মানুষেরাই এই
প্রাচীর টুকরোগুলো দেখেন ‘গণতন্ত্র,
নাগরিক অধিকার ও পুবের ওপর
পশ্চিমের বিজয় চিহ্ন’ হিসেবে।
জার্মানির একটা গোয়েন্দা সংস্থার
হিসাব অনুযায়ী বার্লিন প্রাচীরের
মাত্র
একটা টুকরো রাশিয়াতে থাকলেও
প্রায় ১০০
টুকরো ছড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের
বিভিন্ন শহরে। ১৯৮৯ সালের ৯
নভেম্বর বার্লিন প্রাচীরের পতনের
মাত্র এক দিনের মধ্যেই ব্যাভারিয়ার
এক ব্যবসায়ী প্রাচীরের
একটা টুকরো নিজের
কাছে নিয়ে যেতে সক্ষম
হয়েছিলেন। একসময় যে প্রাচীর
রক্ষা করার জন্য বর্ডার গার্ডস
নামে বাহিনী তৈরি করা হয়েছিল,
সেই প্রাচীর দ্রুতই
টুকরো টুকরো হয়ে যেতে শুরু করে।
১৯৯০ সালের ৪ জানুয়ারি এক
সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বৈদেশিক
মুদ্রার
সংকটে থাকা অন্তর্বর্তী জিডিআর
সরকার প্রাচীরের কংক্রিট-
স্লাবগুলো খুলে ফেলার
এবং সেগুলোকে ‘বাণিজ্যিক
কাজে ব্যবহার করার’ অনুমোদন দেয়।
বার্লিন প্রাচীর
বলে আমরা যা বুঝি তা আসলে একটা
বরং দুটো প্রাচীর। একটা পূর্ব
জার্মানির নির্মাণ করা,
যা ‘হিন্টারল্যান্ড ওয়াল’
নামে পরিচিত। আরেকটা বিশাল
পরিখা মা মৃত্যুকূপসহ নির্মাণ
করা পশ্চিম জার্মানির প্রাচীর। রং-
বেরঙের গ্রাফিতিসহ বার্লিন
প্রাচীরের পরিচিত টুকরোগুলো মূলত
পশ্চিমের। ভেঙে ফেলার পরপরই
জাপানের
একটা কোম্পানি গ্রাফিতিসহ
প্রাচীরের একটা টুকরোর জন্যই এক
লাখ ৮৫ হাজার ডলার দাম
হাঁকিয়েছিল মোনাকোতে অনুষ্ঠিত
এক নিলামে। এমন কাছাকাছি দামেই
দ্রুত বিকোতে শুরু করে একসময়ের
কুখ্যাত বার্লিন প্রাচীরের
টুকরোগুলো।
সাম্প্রতিক এক জরিপে জার্মানির
বাইরে বার্লিন প্রাচীরের প্রায় ৬০০
আস্ত কংক্রিট-স্লাব
খুঁজে পাওয়া গেছে। প্রাচীরের এই
অংশগুলো ছড়িয়ে আছে দুনিয়ার
১৪০টি স্মৃতিসৌধ আর গুরুত্বপূর্ণ
পর্যটনকেন্দ্রে।
অস্ট্রেলিয়া থেকে বাহামা পর্যন্ত
দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে আছে সেসব।
উত্তর কোরিয়ার সীমান্ত থেকে ৩০
কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ কোরিয়ার
উইজেংবু শহরে বার্লিন প্রাচীরের
এমন পাঁচটা কংক্রিট-স্লাব
দাঁড়িয়ে আছে। এই উদ্যোগের
পেছনের মানুষেরা মনে করেন,
একদিন উত্তর আর দক্ষিণ কোরিয়ায় পূর্ব
আর পশ্চিম জার্মানির মতো পুনরায়
একত্র হবে বলে তাঁদের আশার প্রতীক
বার্লিন প্রাচীরের এই অংশগুলো।
জ্যামাইকার রাজধানী কিংস্টনের
আপ-পার্কে দাঁড়িয়ে আছে বার্লিন
প্রাচীরের একটা টুকরো। ২০০৯
সালের বিশ্ব অ্যাথলেটিক
চ্যাম্পিয়নশিপের পর দৌড়বিদ উসাইন
বোল্টকে তা উপহার দিয়েছিলেন
বার্লিনের মেয়র ক্লাউস
ভোভারাইট। জার্মানির
বাইরে বার্লিন প্রাচীরের
সবচেয়ে বড়
সংগ্রহটি দাঁড়িয়ে আছে পোল্যান্ড
সোসনোভকা গ্রামে। পোলিশ দন্ত্য
চিকিৎসক লুডভিক ভাসেচকি বার্লিন
প্রাচীরের ৪০টি কংক্রিট-স্লাব
জড়ো করে সেগুলো দিয়ে এক
বিশাল স্থাপনা শিল্প নির্মাণ
করেছেন।
কিন্তু বার্লিন প্রাচীরের কিছু অংশ
হয়তো চিরদিনের জন্যই
হারিয়ে গেছে। ১৯৯৮
সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল
ক্লিনটনকে বার্লিন প্রাচীরের
একটা টুকরো উপহার দিতে সম্মত হয়
জার্মানি। কিন্তু বিশেষ কারণে ওই
হস্তান্তর অনুষ্ঠান
ভেস্তে গেলে তা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠ
কথা জানায় জার্মানি। বার্লিন
থেকে হামবুর্গ
হয়ে জাহাজে করে তা পাঠিয়ে দে
যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরে। কিন্তু
ক্লিনটন তত দিনে মনিকা লিউনস্কির
সঙ্গে যৌন সম্পর্কের
কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ায় ওই
হস্তান্তর অনুষ্ঠান আর
হয়নি এবং বাল্টিমোরের গুদাম ঘর
থেকেও প্রাচীরের টুকরোটি উধাও
হয়ে যায়। কিন্তু ১৯৯৮ সালের
ফেব্রুয়ারিতে এক সংবাদ সম্মেলনের
পশ্চাৎপটে ক্লিনটনের
পেছনে বার্লিন প্রাচীরের
গ্রাফিতি করা একটা টুকরো দেখা যা
যাতে ইংরেজিতে ‘ফ্রিডম’
কথাটি লেখা ছিল। অবশ্য
পরে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক
অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এক ভিন্ন
গল্প। পররাষ্ট্র দপ্তরের আট তলায়
ক্লিনটনের পেছনে বার্লিন
প্রাচীরের
যে টুকরোটা দেখা গিয়েছিল,
সেটা নাকি আসলে কার্ডবোর্ডের
একটা রেপ্লিকা বা অনুকৃতি ছিল
মাত্র!